৮ বছর ধরে জরাজীর্ণ টিনের ঘরে পাঠদান, বৃষ্টি হলেই ভিজে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা
মোঃ হাসান আলী
গোসাইরহাট শরীয়তপুর প্রতিনিধি
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে নেই পাকা ভবন, নেই নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যুৎ সংযোগ। বর্ষা নামলেই টিনের চাল ফুঁড়ে পানি ঝরে শিক্ষার্থীদের মাথায়। ভিজে যায় বই-খাতা, নষ্ট হয় পাঠদানের পরিবেশ। আবার প্রচণ্ড রোদে টিনের ঘরটি পরিণত হয় আগুনের চুল্লিতে। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
এভাবেই টানা ৮ বছর ধরে জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘরে চলছে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের পশ্চিম চরবিশকাটালী গ্রামের ৭৭ নং চরমাদারীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান।
স্থানীয় ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৯১ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৩ সালে ভয়াবহ নদীভাঙনে বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পশ্চিম চরবিশকাটালী গ্রামে বিদ্যালয়ের নামে ৪০ শতাংশ জমি কিনে সেখানে পাঠদান শুরু হয়। স্থানীয় সরকার ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় একটি টিনের ঘর নির্মাণ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হলেও জমি-সংক্রান্ত জটিলতায় স্থায়ী ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালে জমির জটিলতা শেষ হলেও বিদ্যালয়ের ভাগ্য আর বদলায়নি। একাধিকবার ভবন নির্মাণের বরাদ্দ ও টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হলেও নানা কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। ফলে ৮ বছর ধরে একই জরাজীর্ণ টিনের ঘরেই চলছে পাঠদান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের টিনের চালের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র, চারপাশের টিনের বেড়া ভাঙাচোরা, দরজা-জানালাও নেই। বৃষ্টি শুরু হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়তে থাকে। বই-খাতা বাঁচাতে এক বেঞ্চ থেকে আরেক বেঞ্চে ছুটে বেড়ায় শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ২৬১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় গরমে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে জানান শিক্ষকরা।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুক্তা দৈনিক আলোকিত সকালকে বলে, বৃষ্টি হলে আমাদের বই-খাতা ভিজে যায়। অনেক সময় ক্লাস করা যায় না। আমরা সবাই একটা নতুন স্কুল চাই।
চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মো. মাসুম বলেন, গরমের সময় ক্লাসের ভেতরে বসে থাকতে খুব কষ্ট হয়। ফ্যানও নেই। নতুন স্কুল হলে ভালো হতো।
অভিভাবক সান্তনা বেগম দৈনিক আলোকিত সকলকে বলেন, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকি। ঝড়-বৃষ্টি হলে ভয় লাগে, যদি টিনের ঘর ভেঙে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। সরকার একটি ভবন নির্মাণ করে দিলে সন্তানরা নিরাপদে পড়াশোনা করতে পারবে।
আরেক অভিভাবক আবুল হাশেম দৈনিক আলোকিত সকলকে বলেন, আমাদের এই চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করেন। অনেক কষ্ট করে সন্তানদের স্কুলে পাঠাই। কিন্তু বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে ভয় লাগে। ঝড়-বৃষ্টি হলেই চাল ফুঁড়ে পানি পড়ে, ভিজে যায় শিশুদের শরীর ও বই-খাতা। এটি খুবই দুঃখজনক।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শাহজাদ হোসেন ও রাহিমা আক্তার বলেন, বিদ্যালয়ে ২৬১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বসার বেঞ্চের সংকট রয়েছে। দরজা-জানালা ভাঙা থাকায় ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণ প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোফাজ্জল হোসেন দৈনিক আলোকিত সকলকে বলেন, নদীভাঙনের পর থেকে আমরা এই টিনের ঘরেই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। জমির জটিলতা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এরপর কয়েকবার ভবনের বরাদ্দ এসেও বাতিল হয়েছে। বর্ষাকালে ক্লাস নেওয়া খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের সময় শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে যায়। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত একটি নতুন ভবন নির্মাণের জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে গোসাইরহাট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনির উজ্জামান খান দৈনিক আলোকিত সকলকে বলেন, উপজেলায় এটিই একমাত্র জরাজীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমি এখানে দায়িত্ব গ্রহণের আগেও বিদ্যালয়টির নতুন ভবন নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন কারণে সেই টেন্ডার বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুনরায় মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..